অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফল


সফিকুজ্জামান

বিগত মার্চ ২০২০ থেকে কোভিড ২০১৯ এর জন্য আমাদের রাজ্যের সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতির প্রতিকূলতার জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যে সঠিক তা আর নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা নেই। অতিমারীর দুঃসময়ে সতর্কতা বজায় রেখে বিদ্যালয় স্তরে ছাত্র -ছাত্রীদের জন্য অভিভাবক-অভিভাবিকাদের মাধ্যমে MDM রেশনের নবম পর্যায় পর্যন্ত চাল,আলু,ছোলা,সাবান দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় মানুষের যে উপকার হয়েছে,তা অস্বীকার করা যায় না।গৃহবন্দী ছাত্র -ছাত্রী শ্রেণি কক্ষের পাঠ ছেড়ে,বেশ কয়েকমাস মানসিক ভাবে কিছুটা হতাশ হয়েছিল।তারপর ধীরে ধীরে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে ডারউইনের "অভিযোজন" তত্ত্বের মতো।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও অফিসিয়ালি কাজকর্ম চলছে।সমস্ত বিদ্যালয়গুলিতে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করানোর কাজ বাংলার শিক্ষা ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে করানো হয়েছে;গত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে। নতুন শ্রেণীতে ভর্তির কাজ প্রায় শেষ,ট্রান্সফারের কাজও চলছে।

  বিগত মাসগুলোতে অনেক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন পাঠদান ব্যবস্হা গৃহীত হয়েছে। অধিকাংশ ছাত্র -ছাত্রী এই ব্যবস্থায় উপকৃত হচ্ছে। কলেজ স্তরেও অনলাইন ক্লাস চলছে,এমনকি অনলাইন পরীক্ষার সঙ্গে কলেজ ছাত্র -ছাত্রীরা এখন সুপরিচিত। নামী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে অনলাইন ক্লাসের  উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।সাধারণত আগের দিনেই ক্লাস শিডিউল দিয়ে দেওয়া হয়,মূল্যায়নের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শিডিউল জানানো হয়।তারপর সমস্ত ছাত্র -ছাত্রীদের প্রাপ্ত নম্বরও জানানো হয়।অনলাইন ক্লাসের সুবিধা হচ্ছে, কোভিড পরিস্থিতিতে বাইরে না বেরিয়ে ছাত্র -ছাত্রীরা ঘরে বসে পাঠ পাঠ অনুশীলন করতে পারছে।তবে এই ব্যবস্থায় Short Type Question -Answer এর পাঠদানের কোনো সমস্যা হচ্ছে না,কিন্তু ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি,বায়োলজি, ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতি বিষয়ের  Broad Type এর Question -Answer আশানুরূপ হচ্ছে না;এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ম্যাথামেটিক্স।অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় শ্রেণিকক্ষে বসে প্রত্যক্ষ পাঠ গ্রহণ যে অধিকতর আকর্ষণীয় ও মনোগ্রাহী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।শ্রেণিকক্ষের সজীবতা,প্রাণবন্ত রূপ অনলাইন ক্লাসে নেই, ছাত্র -ছাত্রীরা অনলাইন ক্লাসে উৎসাহহীন হয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে আগ্রহী না-ও হতে পারে।কে কেমন আগ্রহ নিয়ে পাঠে অংশগ্রহণ করছে শিক্ষক মহাশয় সেটা লক্ষ্য করতে পারেন না।তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণাও দেওয়া সম্ভব হয় না।

  আমাদের রাজ্যের প্রচুর ছাত্র -ছাত্রী খ্যাত ও অখ্যাত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে পড়াশোনা করে। অনেক নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত অভিভাবক সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করবার স্বপ্ন পূরণের আশা নিয়ে মাসের শেষে শেষ সম্বল টুকু দিয়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ফিস মেটান।কোভিড পূর্ববর্তী সময়ে সাধারণ অভিভাবকগণ নগদ অর্থ প্রদান করে Payment Receipt সংগ্রহ করতেন।কিন্তু অনলাইন সিস্টেমের জন্য Net Banking, Google Pay,Phone Pay,Paytm, Debit Card প্রভৃতির মাধ্যমে মাসিক ফিস পেমেন্ট করেন।পেমেন্ট এর প্রমাণ হিসাবে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের হোয়াটসঅ্যাপে মোবাইলে প্রাপ্ত ম্যাসাজটি পাঠাতে হয়।কোনো ম্যানেজারের transaction message পছন্দ না হলে বিপদে পড়েন অভিভাবক। ম্যানজারদের এক একজনের এক একরকমের transaction পছন্দ, কেউ Net Banking এর প্রাপ্ত ম্যাসেজ পছন্দ করেন না অথচ Google Pay ভীষণ পছন্দ। আবার কারো Google pay পছন্দ নয় অথচ Net Banking পছন্দ। ম্যানেজারের পছন্দ না হলে Monthly Payment Receipt পেতে এবার payment এর প্রমাণ জোগাড় করুন;আর ততদিনে হয়তো প্রদেয় অর্থ প্রতিষ্ঠানের Account holder উঠিয়ে নিয়েছেন।অভিভাবক কিন্তু যাঁতাকলে পেষাই হতেই থাকলেন মাসের পর মাস।যে কোনো মাধ্যমের transaction এর প্রাপ্ত ম্যাসেজই যে যথেষ্ট প্রামাণ্য সফটকপি,transaction, reference এগুলো একটু কষ্ট করে মিলিয়ে দেখে নেওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। অকারণে অভিভাবক হয়রানি করানোটা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হানার সামিল।

  রাজ্যের নামী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে বহু দূর দূরান্তের ছাত্র -ছাত্রী ভর্তি হয়ে আছে। এই সমস্ত ছাত্র -ছাত্রীদেরকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো কিছু সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ানোর ব্যবস্থা করে।মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সংশ্লিষ্ট উচ্চবিদ্যালয় থেকে Banglar Siksha Portal এর থেকে T.C নিতে হয় এবং ছাত্রীরা কন্যাশ্রী transfer transform from সংগ্রহ করে। সরকারি বিদ্যালয়গুলো থেকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো T.C সংগ্রহ করে দিলেও কন্যাশ্রী transfer এর বিষয়ে আগ্রহী নয়।অভিভাবক বিদ্যালয়ে সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেন হেডমাস্টার মহাশয় আছেন কিন্তু কন্যাশ্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত শিক্ষক বা ক্লার্ক অনুপস্থিত।অনেক সময় দেখা যায়  অভিভাবককে ফিরে আসতে হয় ১৫০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে, হেডমাস্টার মহাশয়ের মোবাইল নম্বরটা সান্ত্বনা হিসাবে সেভ করে  নিয়ে বাড়ি ফিরেন। পরের দিনগুলোতে হেডমাস্টার মহাশয় আর ফোন রিসিভ করেন না;ফলে জানা যাবে না যে,কন্যাশ্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত শিক্ষক বা ক্লার্ক কোনদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকছেন।এর ফলে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অনেক ছাত্রী কন্যাশ্রী সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নবম এবং একাদশ শ্রেণিতে পাঠরত শিক্ষার্থীদের বোর্ড এবং কাউন্সিলের রেজিষ্ট্রেশন হয়ে গিয়েছে।এখন signature check list এ signature করাবার জন্য এই করোনাকালীন পরিস্থিতিতে অভিভাবকগণ তাদের প্রিয় সন্তানদের নিয়ে  কেউ কোচবিহার বা মালদহ থেকে ছুটবেন কলকাতা, আবার দক্ষিণ ২৪ পরগণা বা মেদিনীপুর থেকে কেউ কেউ ছুটে যেতে বাধ্য হবেন শিলিগুড়ি বা দার্জিলিং। এই signature check list এর কাজটা খুব সহজ-সুন্দরভাবে করা যায়, যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো থেকে এক একজন প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দিয়ে জেলায় জেলায় পাঠানো হয়।কেবলমাত্র ছাত্র -ছাত্রীদের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও সহাযোগিতার মানসিকতা প্রয়োজন।

  অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি প্রাথমিক  বিদ্যালয়ের ছাত্র -ছাত্রীরা।কারণ অনলাইন বা অফলাইন দুটো থেকেই তারা বঞ্চিত। দীর্ঘদিন পাঠ বিমুখ থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে অথচ তাদের শিক্ষণীয় বিষয়ের ঘাটতি থেকে গেলো অনেক। এই অপূরণীয় ক্ষতি কীভাবে মেটানো সম্ভব হবে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তার বিষয়। যারা টিউশন নিচ্ছে তাদের ঘাটতি অনেকটাই কম হবে,কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে টিউশনির সুযোগ থেকে বঞ্চিত।প্রাথমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও যারা উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে তাদের টিউশনির জন্য গ্রামাঞ্চলে কোনো বিজ্ঞান বিভাগের টিউশনি টিচার পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। আবার কোভিডের জন্য অভিভাবকেরা ছেলে-মেয়েদের শহরে টিউশনিতে পাঠাতেও ভয় পান।গ্রামীণ বাংলায় স্মার্ট ফোনের আজ আর অভাব নেই ;কিন্তু সকলেরই যে নিয়মিত নেট রিচার্য করবার মতো সাধ্যনেই তা সহজ অনুমেয়।সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা যায় যে,কোভিড পরিস্থিতিতে  গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

   যে সমস্ত ছেলে-মেয়েদের অভিভাবকেরা পড়াশোনার জন্য তাদের হাতে নতুন নতুন স্মার্ট ফোন তুলে দিয়েছেন সেই ছেলে-মেয়েরা অনলাইন ক্লাস করছে ঠিকই কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ঐ ছেলে-মেয়েরা স্মার্ট ফোন অকারণে  অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে।এক কথায় বলা যায় ঐ ছেলে-মেয়েরা Mobile Addiction বা মোবাইল আসক্তিতে ভুগছে।যারা নীচু ক্লাসের ছাত্র -ছাত্রী, ষষ্ঠ, সপ্তম থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠরত তারাই নেশাগ্রস্থ হয়ে সময় অপচয় করছে বেশি - ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, বিভিন্ন রকমের গেম প্রভৃতি যেন তাদের জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ।এর ফলে আগামীদিনে তাদের শারীরিক ক্ষতি,  মানসিক বিকাশ,সামাজিক বোধের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা আমাদের দেশে কমে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু ইউরোপের দেশগুলিতে আরও বিপদজনক ভাবে শুরু হয়েছে কোভিডের নতুন ঢেউ।এই দ্বিতীয় ঢেউ যদি আমাদের মতো দরিদ্র দেশে আছড়ে পড়ে তাহলে তার ক্ষতি হবে সুদূরপ্রসারী।আগামীতে অনলাইন পঠন পাঠনই যদি  আমাদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরো কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।আর যদি কোভিড প্রতিরোধী টিকাকরণ করিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অঙিনায় আনা যায় তবেই সমস্যা সমাধানের রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয়।তবুও ছাত্র -ছাত্রীরা যে নেশায় আসক্ত হয়েছে তা থেকে মুক্ত করবার জন্য শিক্ষক-অভিভাবকের গুরু দায়িত্ব রয়ে যাবে।একদিন বা দুইদিনে এই সমস্যার সমাধান হবে না,দীর্ঘ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সহানুভূতির সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের এই নেশামুক্তি ঘটাতে হবে। 

মন্তব্যসমূহ