ছোটো গল্প
আলো-আঁধারের পথে
সফিকুজ্জামান
মায়ের মৃত্যুর পরে নবম শ্রেণির ছাত্র সবুজ মানসিক ভাবে বেশ কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।বাবা আবীর হোসেন ছেলের মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করে কয়েকদিনের জন্য তার মামা বাড়িতে নিয়ে গেলো।কিন্তু দু'দিন বাদে আবীর বুঝতে পারলো -এই মাটিতে যে বৃহৎ শিকড়টা এতোদিন ছিলো,তা কালবৈশাখীর ঝড়ে পুরোপুরি উপড়ে গেছে।তাই ডালপালার সবুজ পাতাগুলোর এখন বিবর্ণ চেহারা। সে ছেলেকে নিয়ে ফিরে আসতে চায়লে সবুজের মামা-মামীমা,দাদু-দিদার আপত্তির জন্য আজ হুগলি থেকে একা একাই ফিরে এলো হাওড়ার ফ্ল্যাটে।এদিকে মামা বাড়িতে সবুজের দুই -তিন মাস কেটে গেলো কিন্তু সে এখনও পড়তে বসে না,খেলতেও যায় না,সব সময় একা থাকতে চায়।মামীমার ডাকে তার মাকে মনে পড়ে, খেতে খেতে খাওয়া বন্ধ করে চলে যায়।নদীর ঢেউ, পাখির গান,চাঁদের হাসি এখন তার হৃদয়ে আর আগের মতো সোনালী রঙের জোয়ার বয়ে আনে না।পোস্ট অফিস কর্মচারী আবীরের দিন-রাতগুলো যেন কার অভিশাপে বহু দীর্ঘতর বেসুরো হয়ে উঠছিলো। সেই অকাল অভিশপ্ত সুরের ঢেউ থেকে সে নিজেকে মুক্ত করবার জন্য হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কেটে তীরে ওঠার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করছিলো।স্ত্রী গত হওয়ার পর আবীরের বন্ধুরা তার ফ্ল্যাটে প্রতি সন্ধ্যায় আড্ডা জমাতে আসতো,তারা চলে যেতেই নেমে আসতো এক অচেনা মায়াবী নিস্তব্ধতা।এই নিরুত্তাপ জীবনের আলো-আঁধারের পথ ধরে আবীর ক্রমশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লো।বন্ধুরা তার একাকীত্ব দূর করবার জন্য তার প্রিয় এক গানের অনুষ্ঠানে নিয়ে গেলো।সকলেই জানতো যে আবীর বেশ ভালোই গান গায়।অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে কয়েকটা গান গায়তে হলো।সেই রাতে পরিচয় হলো ব্যারাকপুরের গায়িকা মালা আহাম্মদ এর সঙ্গে।
এখন মালা আবীরের সঙ্গে চ্যাট করে, কখনও বা ভিডিও কল করে আর মোবাইলেও কথা হয় মাঝে মাঝে। দিন যত যায় মিডিয়ার সম্পর্কটা ততই বাড়তে থাকলো।একদিন আবীর বললো,"মালা,আগামী রবিবার তুমি কলকাতা আসতে পারবে?"মালা,"খুব প্রয়োজন না থাকলে তুমি আমার ব্যারাকপুরের বাসাতে আসতে পারো।" আবীর মনে মনে খুশি হয়ে সম্মতি জানালো।এতোদিনের কথাবার্তায় আবীর একবারও তার স্ত্রীর মৃত্যুর কথা জানায়নি, কারো সহানুভূতি তার পছন্দ হতো না।কিন্তু মালার বাসায় এসে অবাক হলো- বছর চল্লিশের মালা পাঁচ বছর আগেই দূর্ঘটনায় তার স্বামীকে হারিয়েছে, রেখে গেছে দশ বছরের এক সুন্দর ফুটফুটে চেহারার মেয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মালার জীবন যুদ্ধটা যে কতোটা ভয়ংকর আবীরের চেয়ে আর কে ই বা বেশি বুঝবে।সেদিন থেকে আবীর আর মালার বন্ধুতা আরও গাঢ় হলো,মালার যে কোনো প্রয়োজনে আবীর ছুটে আসে।মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন পার্কে তারা ঘুরে বেড়ায়,ইতিমধ্যে আবীরের বাসাতেও বেশ কয়েকবার এসেছে। আগোছালো জিনিসপত্র, জামাকাপড় পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখে যায় মালা।আবীর তার মনের কথাটা ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় মালাকে,মালাও বুঝতে পারে যে আবীর তাকে ভালোবাসে;বিয়ে করতে চায়।মালাও মনে মনে এই প্রস্তাবটার জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলো।প্রসঙ্গ পেয়ে মালা জানতে চাইলো, "তুমি কি আমার মেয়েকে মেনে নেবে?বিয়ে হলে আমি মেয়েকে আমার সঙ্গেই রাখতে চাই। তাছাড়া বড়ো হলে ওর বিয়ের দায়িত্বটাও কি তুমি নেবে?" আবীর, "ও তো আমারও মেয়ে,সুতরাং ওর সব দায়িত্বই আমার। " মালা,"আর তোমার ছেলে?"আবীর, "তার খরচের জন্য যা প্রয়োজন সেটা তো আমি মাসে মাসে দিয়ে আসি,সে এখানে আসতে চায় না।ভবিষ্যতে আমার সম্পদের অর্ধেক তোমাকে আর বাকি অর্ধেক আমার ছেলেকে দেবো।" মালা,"তোমার ছেলে কি আমাকে মা বলে মেনে নেবে?"আবীর, "কেউ মেনে না নিলেও তো আমার আর কিছুই করবার নেই, এভাবে কি আমরা দু'জন ভেসে বেড়াবো?" মালা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো,"চলো আজ হাওড়া ফেরিঘাটে গিয়ে লঞ্চে খানিকটা ঘুরবো।"
সবুজের মামা বাড়িতে আবীর আর মালার সম্পর্কটা আর অজানা রইলো না।মামা-মামীমা,দাদু-দিদা সবুজের সামনেই বলে যে,ঐ মালা মেয়েটার জন্যই আবীর তাদের মেয়ে শিউলিকে মেরে ফেলেছে। সবুজের মামীমা বললো,"বাবা,তোমরা বিয়ে দেওয়ার আগে একটু ভালো করে খোঁজ নাওনি কেন?ওর না-কি প্রথম প্রেমিকা ঐ মালা মেয়েটা।ওর সঙ্গে বিয়ে হয়নি বলেই আমাদের শিউলিকে বিয়ে করেছিলো।" মামা,"তারপর বরটা মারা যেতেই ডাইনিটা আবার আবীরের পিছনে লাগলো।"সবুজের মনের মধ্যে দীর্ঘদিন আবর্তিত হওয়া প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছে আজ।বাবার প্রতি তার যে শ্রদ্ধা, সম্মানবোধ ছিলো -সেসব নিঃশেষ হয়ে ঘৃণায় পর্যবসিত হলো।এখন বাবাকে একজন নিকৃষ্ট খুনি ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না সে।হাওড়া রেলস্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে দশ মিনিটে পৌঁছানো যায় আবীরের ফ্ল্যাটে,সেখানে আর আগের মতো জীবনের স্পন্দন নেই, হাওড়া ব্রীজের মতোই ভাসমান আবীরের জীবন। কেবলমাত্র তার নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে নদীর জলের মতো অধরা মালার স্নিগ্ধ মুখ।আবীর অনেক আকুতি নিয়ে যতদূর পারে নীচের দিকে হাত বাড়ায় কিন্তু সে জল স্পর্শ করতে পারে না।সবুজ মামা-মামীমার পরামর্শে আবীরের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি তার নিজের নামে রেজিস্ট্রিকরণ করাবার দাবী জানালো।সে মামা বাড়িতে যতই বাবার দূর্নাম শোনে ততই ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। মনে মনে পরিকল্পনা করে সম্পত্তি রেজিষ্ট্রেশন হয়ে গেলেই মায়ের মৃত্যুর চরম প্রতিশোধ নেবে।আবীর বুঝতে পারলো মায়ের স্নেহ বঞ্চিত ছেলের অবস্থা। সন্ধ্যা নামার আগেই সতেজ শিউলি তার জীবন বৃন্ত থেকে ঝরে গেলো।দুটো কিডনিই নষ্ট হলো,জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেও তাকে ফিরানো গেল না।ভেবেছিলো ব্যাঙ্গালোরে ডাক্তাররা নিশ্চয়ই কিছু একটা উপায় খুঁজে পাবে,কিন্তু না কেউই কিছুই করতে পারলো না।এই ফ্ল্যাট এখন তার আর ভালো লাগে না।প্রতিটা ইঞ্চিতে ছড়িয়ে আছে শিউলির স্মৃতি বিজড়িত ভালোবাসা।সে এই স্মৃতি ভুলতে চেয়ে মালার হাত শক্ত করে ধরতে চায়,নতুন জীবন নতুন সংসার,নতুন করে বাঁচতে চেয়ে ব্যারাকপুরের কাছে শ্যামনগরে একটা ফ্ল্যাট কিনলো,দমদম রেলস্টেশন থেকেও বেশি দূর নয়,ফ্ল্যাটটা মালারও বেশ পছন্দ। এখানেই দু'জনে নতুন ঘর বাঁধবে।এদিকে ছেলের দূর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে আবীর বহরমপুরে ট্রান্সফার নিলো।ছুটিতে হাওড়া যে আসে না তা নয়,তবে মালার অনুরোধে তার বাসাতেই বেশি থাকতে হয়।এভাবেই কেটে গেলো দুটো বছর, মালা এখন যথাশীঘ্র বিয়েটা সেরে ফেলতে চায়-পাড়ার লোকে পিছনে অনেক কথা বলে।কিন্তু মালার মেয়ে শ্রাবণী বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে,তার সঙ্গে আবীরের কোনো মিল নেই। বাবার হাসি ভরা মুখ,কোলে নিয়ে আদর করা এসব ছবি আবছায়া হলেও তার মনে পড়ে। শ্রাবণী ভাবে- মা কেন লোকটাকে খুব ভালোবাসে?শ্রাবণী মা কে বললো,"আমি ঐ লোকটাকে কোনোদিন বাবা বলে ডাকতে পারব না মা।"মালা,"দেখ,আমাদের দেখাশোনা করবার মতো কেউ নেই, তোর মামাদের সংসার আছে;তাদের বোঝা হয়ে আর থাকতে চাই না।ও তো তোকে মেয়ের মতোই ভালোবাসে।"শ্রাবণী, "একজন পর লোক কি কখনও বাবা হতে পারে মা?তুমি কি করে ওকে আমার বাবার জায়গায় বসাবে?" মালা,"তুই ছোটো ছোটোদের মতো থাক,তোর ভালো-মন্দের চিন্তা আমার।আবীর তো তোকে গ্রহণ করতে চেয়েছে,তুই অতশত চিন্তা করিস না।"
মালা-আবীরের বিয়ের কথা ফাইনাল হলো,দু'মাস পরেই দু'জনে ছুটি নেবে।অল্প কয়েকজন বন্ধু নিয়ে রেজিষ্ট্রেশন ম্যারেজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে মালার ইচ্ছা অনুযায়ী মার্কেটিং সেরে নিলো।তারপর দু'জনে যথা সময়ে নিজেদের বন্ধুদের নিমন্ত্রণ পর্ব সেরে নিলো।সামনে পড়ে রয়েছে আর মাত্র দুটি সপ্তাহ।একটা সপ্তাহ বহরমপুরে থেকেই ফিরে আসবে আবীর।ইদানিং সবুজকে নিয়ে মামা-মামীমার নিত্য ঝগড়ার কারণে সে হাওড়ার ফ্ল্যাটে চলে এসেছে।সবুজ রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে-বাবা যেন বিষন্ন মুখে জুতো -পাঞ্জাবি পরে কুয়াশার ভিতরে মিশে যাচ্ছে, মা সবুজকে বলছে-বাবাকে ধরে আন বাবু, ধরে আন।ঘুম ভেঙে চোখেমুখে জল দিয়ে সবুজ আবারও বিছানায় শুয়ে পড়লো।কয়েকবার মনে পড়লো -মায়ের সুন্দর মুখখানি,কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস ঘরের বাতাসে মিশে গেলো।সে ভাবলো,"মা না থাকলে পৃথিবীর বাবাগুলো কি পর হয়ে যায়?" বাবা তো তাকে এই ফ্ল্যাট আর বেশ কিছু সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছে -এখন বাবার যদি কিছু হয় তার কোনো ক্ষতি হবে না।এসব চিন্তা করতে করতে আবারও ঘুমিয়ে পড়লো।প্রতিদিন বিকেলের মতো আজও সবুজ বাইক নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে ছিলো।হঠাৎ উল্টোদিক থেকে ছুটে আসা একটা বাস তাকে সজোরো আঘাত করলো।পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে পিজি হাসপাতালে ভর্ত্তি করালো।আবীরের এক বন্ধু দূর্ঘটনা সংবাদ শুনে সবুজের দেখাশোনা করছিলো।আবীরও দ্রুত বহরমপুর থেকে কলকাতা ফিরেছে।হাসপাতালের বেডে আবীরের বন্ধু সবুজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার বাবা-মায়ের গল্প শোনালো। বাবা যখন তার মাকে নিয়ে দিশেহারা তখন তার মামা-মামীমা শুধু চোখের দেখা দেখেছিলো;তার দাদু সম্পত্তি বিক্রি করে কিডনি সংগ্রহ করবার কথা বলে মামা-মামীমার দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনার পাত্র হয়ে উঠেছিলো। বাবার সঙ্গে সবুজের অন্যায় আচরণগুলো মনে পড়লে সে খুব কেঁদে কেঁদে বাবার কাছে ক্ষমা চাইলো।হাসপাতাল থেকে ফ্ল্যাটে ফিরে দু'দিন পরে রাত্রিতে আবীরের মোবাইল কল ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে মালার নামটা ফুটে উঠলো।অনিচ্ছা সত্ত্বেও কল রিসিভ করলো।মালা,"সবুজ কেমন আছে এখন?" উত্তর দিলো,"ভালো।" মালা,"আগামীকাল সকালেই চলে এসো,আমার বাবা-মা আজই চলে এসেছে ;বান্ধবীরা কাল সকাল সকাল পৌঁছে যাবে।বেলা ১১টার মধ্যে বিয়েটা সারতে চাই।"আবীর কোনো উত্তর দিলো না,মালা,"কথা বলছো না কেন?"কয়েকবার উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করলো।আবীর বিরক্ত হয়ে মোবাইলের সুইচ অফ করে দিয়ে ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখলো- না তার মুখে এখন আর কোনো উদ্বেগের ছাপ নেই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন