ছোটো গল্প

 ঋণ

সফিকুজ্জামান 

আকাশ নিবিষ্ট মনে ছবি আঁকছিলো- দু’টি পাখি উড়ে যাচ্ছে স্বপ্নের সন্ধানে,সুন্দর নীল আকাশে কোথাও একখণ্ড কালে মেঘের রেখা নেই, নেই ঝড়ের কোনো পূর্বাভাস।এমন সময় তার মোবাইল সেট বেজে উঠলো,স্ক্রিনে দেখা গেলো তনুজার নাম।রিসিভ করতেই তনুজা বললো, "সারাদিনে কী করো,৪-৫ টা মিস কল আছে দেখো।একটু রিসিভ করার সময়টাও আজকাল পাওনা? আকাশ," না,তুমি যা ভাবছো তা নয়;মোবাইল সাইলেন্স মুডে রেখে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি,তাই হয়তো বুঝতে পারিনি। " তনুজা,"ছবি আঁকা, কবিতা লেখার সময় তো খুব পাও।"আকাশ দার্জিলিং শহরের কনভেন্ট স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে ব্যাঙ্গালোরে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়ছে।তার গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরে ফিরে আসার সময় মৌলানা আজাদ কলেজের ২য় বর্ষের ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী তনুজা তাকে রিসিভ করতে যেতো নেতাজী সুভাসচন্দ্র বিমান বন্দরে।তারপর দু'জনে প্রাইভেট গাড়িতে  বাড়ি ফিরতো।আকাশ যে ক'দিন বাড়িতে থাকতো,তনুজা এসে তার সবকিছুতেই খেয়াল রাখতো।আকাশ বা তনুজার বাবা-মায়ের এই মেলামেশাতে কোনো আপত্তি ছিলো না।আকাশ ধীরে ধীরে তনুজার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়লো।মাঝে মাঝে তার মনে হতো,মা-বাবার চেয়ে তনুজা হয়তো তাকে বেশি ভালোবাসে।সে ধনীর একমাত্র সন্তান হলেও; দিগন্ত প্রসারিত সবুজ মাঠ,নদীর ঢেউ, নীল আকাশ,শ্রাবণের বৃষ্টি, পাখিদের গান তার ভালো লাগতো;তাই মাঝে মাঝে সবকিছু ফেলে নদীতীরের বটগাছটার নীচে গিয়ে বসতো।এরকমই একটা দিনে আকাশের বাইকের পিছনে বসলো তনুজা।দু'জনেই এসে সেই বুড়ো গাছটার নীচে বসলো।আকাশ বললো,"আল্লাহ পাকের কী মহিমা,কতো সুন্দর ত্রুটহীন সৌন্দর্য দেখো।এই সৌন্দর্য আমার হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে,তাই তো আমি বার বার ছুটে এসে তৃষ্ণা জুড়ায়। তনুজা,"তোমার এ-সব পাগলামি আমার ভালো লাগে না।কী কাজে লাগবে তোমার এসব অনুভূতি? ছবি এঁকে বা কবিতা লিখে তুমি কি কোনোদিন বিলিওনিয়ার হতে পারবে?জীবনের জন্য প্রয়োজন কোটি কোটি টাকা। " আকাশ,"বাঁচবার জন্য কিছু টাকা প্রয়োজন ঠিকই, তবে সেটা কোটি কোটি টাকা না হলেও চলে;আর টাকাই জীবনের সবকিছু নয়।তুমি তো সাহিত্যের ছাত্র- , কিটস, বাইরন, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ পড়েছে।" তনুজা, "আমি কেবলমাত্র স্যারদের দেওয়া নোটসগুলো মুখস্ত করি,তাতে নম্বরও ভালোই পাই-সাহিত্য নিয়ে কোনো আবেগ বা অনুভূতি আমার নেই।" তবে তোমার অনুভূতিটা একান্তই ব্যক্তিগত,আমার ভালোলাগাটা তোমার না-ই ভালো লাগতে পারে। ঠিক তেমনি তোমার ভালোলাগা গুলো আমারও ভালো না-ই লাগতে পারে।এই যেমন ধরো,তোমাকে আমার ভীষণ ভীষণ ভালো লাগে কিন্তু তুমি ঠিক তার বিপরীত। "এসব কথা বলতে বলতে তারা উঠে গেলো।বাড়ি ফিরে আকাশ ভাবছিলো - এমন মেয়েকে নিয়ে সে ভবিষ্যতে সংসার করতে পারবে তো? উত্তর খুঁজতে বসে হঠাৎ তার মনে পড়লো-সেবার তার খুব জ্বর হয়োছিলো,তনু সারারাত জেগে তার পাশে বসেছিলো।কখনো জলপটি দেওয়া, কখনো খাবার জল দেওয়া,ওষুধ দেওয়া।এতো গরমে সে ভিজে যাচ্ছিলো,মাঝে মাঝে তোয়া লে-তে মুখ মুছছিলো।সকালে জ্বর ছাড়তেই তার সে কী কান্না! মা যতো বুঝাতে চায় আরও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বলে," আমার ভীষণ ভয় করছিলো।"এক সপ্তাহের ছুটি যেন খুব দ্রুত কেটে গেলো।এদিকে আকাশের বাবা ফরিদ মিঞা পৈতৃক সূত্রে প্রচুর জমি জায়গার মালিকানা পেলেও ইদানীং চাষাবাদ থেকে ভালো আয় হচ্ছিল না।বন্ধু -বান্ধবের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যাঙ্ক ও স্থানীয় কয়েকজন লোকের নিকট থেকে প্রায় এককোটি টাকা ঋণ নিয়ে পার্টস তৈরির কারখানা খুলেছিলো।প্রথম দিকে ব্যবসা মোটামুটি চললেও তেমন মুনাফা না হওয়ার জন্য জমি বিক্রি করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছিলো।কিন্তু বছর ঘুরতেই আর তেমন অর্ডার পাচ্ছিলো না,তবুও প্রাণপণে  ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলো।কিন্তু কারখানার কর্মচারীদের চার মাসের বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য তারা একের পর এক সকলেই কাজ ছেড়ে চলে গেলো।পাহাড় পরিমাণ ঋণের বোঝা পরিশোধ করার জন্য ফরিদ মিঞা জমিজায়গা, বড়ো দুটি পুকুর এমনকী তার ভিটে বাড়িটাও বিক্রি করতে বাধ্য হলো।সেদিনের সম্ভ্রান্ত ফরিদ মিঞা এখন টিনের ছাউনি দেওয়া দু'কামরার একটা বাড়িতে বাস করে।ফরিদকে দেখলেই তার পুরানো বন্ধুরা এডিয়ে যেতো,ভয় পেতো অভাবী মানুষটা যদি বা টাকা ধার চায়।

   আকাশ বাবার দুরাবস্থায় প্রথমদিকে ভেঙে পড়েছিলো।খাবারে রুচি হতো না,স্নান করতে ইচ্ছা করতো না,বেশ কয়েকটা রাত অনিদ্রায় কাটলো।তারপর বাবার পরামর্শ মতো ফ্যাল্ট বিক্রি করে দিয়ে একটা মেসে উঠে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করলো।সে ছবি আঁকা ভুলে গেলো, কবিতা আর মাথায় আসে না।মাঝে মাঝে মনে হয় তার যেন কেউ নেই,  কিছুই নেই। তনুজা এখন আর আগের মতো ফোন করে না।আকাশ কোনোদিন কল দিলেই বলে ব্যস্ত আছি।সে ভাবে তনুও হয়তো পড়াশোনার চাপে ব্যস্ত আছে।হঠাৎ একদিন খুব সকালে তার ফোন বেজে উঠলো। আকাশ,"মা,কী ব্যাপার এই তো গত সন্ধ্যায় ফোন করলে,কিছু হয়েছে?"আরজু,"হ্যাঁ রে,রাত থেকে তোর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।চিন্তা করিস না,ঠিক হয়ে যাবে,বাড়ি ফিরতে পারবি?"আকাশ,"তুমি কোনো চিন্তা করো না মা,ফ্যাল্ট বিক্রির টাকাটা আমার এ্যকাউন্টে আছে,আমি আজই বাড়ি ফিরবো।"সে মুখ ধুয়ে ফ্লাইট বুকিং করে তনুজাকে একটা কল দিলো- অপর প্রান্ত থেকে শোনা গেলো সুইচ স্টপ।ভাবলো ফ্লাইটের এখনো দু'ঘন্টা বাকি,ততক্ষণে তনুজা নিশ্চয় ঘুম থেকে জেগে উঠবে।বাবার এই অসুস্থতার সময়ে তনু পাশে থাকলে তার একটু সাহস বাড়বে।সকালে কিছু খাবার খেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলো।একঘণ্টা পরে তনুজাকে আবারও ফোন দিলো,"হ্যালো তনু,বাবা অসুস্থ আমি ফিরছি;এগারোটা নাগাদ এয়ারপোর্টে চলে এসো।"তনুজার কথা বুঝতে পারলো না,কী যেন বললল-সে জানে!১১ঃ১৫ তে এয়ারপোর্টে পোঁছে এদিক-ওদিক খুঁজে দেখলো,না তনুজা কোথাও নেই।কল করলো- সুইচ স্টপ। ওদিকে ট্রেনের আর বেশি দেরি নেই, হাতে অল্প সময় তাই দ্রুত একটা বাসে উঠে সোজা শিয়ালদহ রেলস্টেশনে পৌঁছালো।সেখান থেকে সরাসরি হাসপাতালে উঠে দেখলো- বাবার মুখটা সামান্য বেঁকে গেছে,ডানসাইডে কোনো অনুভূতি নেই।রাতে মাকে কথা বলার খুব চেষ্টা করেছিলো কিন্তু সবকথা জড়িয়ে যাচ্ছিলো।ডাক্তার বাবু বলেছেন- সেরিব্রাল স্ট্রোক।বাহাত্তর ঘন্টা সময়ের আগে কিছুই বলতে পারবে না।হাসপাতালে সবগুলো ওষুধ পাওয়া যায় নি।আকাশ প্রয়োজনীয় সবকিছু জোগাড় করে দিয়ে ডাক্তার বাবুর কাছে করজোড়ে বললো,"আপনি আমার বাবাকে বাঁচিয়ে দিন,আমি বাবার জন্য আরও বেশি কিছু প্রয়োজন হলে এনেদেব।কিন্তু ফরিদ মিঞা মৃত্যুর সঙ্গে দু'দিন যুদ্ধ করে পরাস্ত হলো।সেই প্রভাবশালী, বিত্তশালী ফরিদ মিঞা যার একডাকে গ্রামের সমস্ত মানুষ হাজির হতো,নতশিরে মেনে নিতো যার কথা- আজ শেষ যাত্রার দিনে তার জানাজায় শরিক হলো মুস্টিমেয় কিছু দ্বীন দরদী মানুষ। গোরস্থান থেকে ফিরে এসেও আকাশ দেখতে পেলো না তনুজাকে,না তার মা-বাবাও আসেনি।এই বিপর্যয়ের দিনে যাকে সবচেয়ে বেশি পাশে পেতে আশা করেছিলো,ভরসা করেছিলো,যার উপরছিলো গভীর বিশ্বাস, সেই কাছের মানুষটাও আজ দূরে রয়ে গেলো।রাতের অন্ধকারে বাড়ির উঠানে আকাশ চুপচাপ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো।মা আরজু তার ভাঙা হৃদয়টা ছেলের চোখে আড়াল করে দক্ষ নাবিকের মতো বললো,"এভাবে কি আর দুঃসময় পেরুনো যায় বাবা?সমুদ্রে যখন ঝড় ওঠে তখন ঢেউগুলোও জাহাজকে গিলে খেতে চায়।কিন্তু ঝড় আর ঢেউয়ের ভয়ে সমুদ্রে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায় কি কখনো, বাবা?"আকাশ, "মা,আমাকে একটু একা থাকতে দাও।" আরজু ধীরে ধীরে সবুজের কাছে গিয়ে বললো,"কষ্ট কখনো মনের মধ্যে লালন করতে নেই রে খোকা,মনের আয়নাতে যতই দেখবি আগাছার মতো বিনা পরিচর্যায় অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাবে।তোর বাবাকে হারিয়ে অনেক ব্যথা পাচ্ছিস কিন্তু তনুজার ব্যবহারে তুই একেবারে হতাশায় ভেঙে পড়েছিস।"আকাশ, "তনু এলো না কেন মা?" আরজু,"তনু যে আসবে না,আর তুই কষ্ট পাবি-সেটা আমি জানতাম।" আকাশ কিছুই অনুমান করতে পারলো না।কয়েকদিন পর হৃদয়ের অস্থিরতা দূর করার জন্য তনুজাকে একটা কল দিলো।তনুজা,"দেখো আকাশ আমাকে অকারণে ডিস্টার্ব করো না,আমার মোবাইল নম্বরটা ডিলিট করে দাও। আমি চাইনা তুমি আর কখনো কল করো,ইউ আর মাই ক্লোজড চ্যাপ্টার।" আকাশ বললো,"কেন,কী হয়েছে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।" তনুজা,"একটা ভিখারির বাচ্চা কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ করে, তোর কী এমন আছে যে তোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে?"ওদিক থেকে লাইন কেটে গেলো,আকাশ যেন শূন্যে ঘুরপাক খেতে খেতে পাথরে মুখ থুবড়ে পড়লো।ভোরবেলায় মা কে নিয়ে সে হাঁটতে শুরু করলো,গ্রামের বড়ো বাড়িটার সামনে আসতেই তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।দাদুর হাতের তৈরি এই বাড়ির আনাচে-কানাচেতে তার অদৃশ্য পায়ের ছাপ পড়ে আছে।ছেলেবেলার দিনগুলোতে বাবার সঙ্গে কতোদিন সাঁতার কেটেছে পাশের ঐ বড়ো দিঘিতে।আজ বাবা নেই, এই বাড়ি,দিঘি কিছুই আর তাদের নেই। চোখের জলে গ্রাম ছেড়ে ব্যাঙ্গালোরের দিকে পা বাড়ালো।

মন্তব্যসমূহ